লক্ষ্মীপূজার মাহাত্ম্য | গরীব ভক্তের গল্প | ভক্তিতে খুশি হলেন মা লক্ষ্মী
👉 Lakshmi Puja Story in Bengali | Power of Devotion | Moral Storyলক্ষ্মীপূজার মাহাত্ম্য
কোন এক গ্রামের নদীর ধারে, মাঠের কোনে থাকতেন এক গরীব মানুষ। ভিক্ষা করেই তাঁর দিন কাটে। একবার তাঁর লক্ষ্মী পূজো করার খুব ইচ্ছা হলো। ইচ্ছা হলে হবে কি? টাকা পয়সা নেই, কি দিয়ে মায়ের পূজোর খৈ, ফল, গামছা, কাপড় এই সব কিনবে তা' ভেবে পেলেন না।
লক্ষ্মীপূজোর আগের দিন, তিনি অতি কষ্টে একটা ছোট্ট লক্ষ্মীর প্রতিমা জোগাড় করে, তাঁর কুঁড়ে ঘরে নিয়ে এলেন। পরের দিন ভিক্ষা করে কিছু ছোলা জোগাড় করে ছিলেন। ফেরার পথে পাড়ার দুষ্টু ছেলেরা তাঁর কাছ থেকে সব ছোলা কেড়ে নিয়ে গেল।
কি আর করবেন তিনি, মনের দুঃখে গাছের নীচে বসে বসে চোখের জল ফেলছেন।
এমন সময় হঠাৎ তাঁর মনে হল রাজবাড়ীতে আজ লক্ষ্মী পূজো হচ্ছে, গেলে হয়। সেখানে এতক্ষনে প্রচুর ফল কাটা হয়েছে। ফলমূল কেটে বাইরে ফেলে দেওয়া ফলের খোসার সাথে কিছু ফলের টুকরো পাওয়া গেলেও যেতে পারে, সেই আশায় তিনি মনের আনন্দে রাজবাড়ীর পথে রওনা হলেন।
হায় কপাল। পরনে তাঁর ছেঁড়া কাপড়, মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি দেখে, রাজবাড়ীর দারোয়ানরা ভিখারি ভেবে তাঁকে তাড়িয়ে দিলেন। মনের দুঃখে তিনি ভিক্ষায় পাওয়া এক মুঠো ক্ষুদকুড়া দিয়ে ভক্তিভরে লক্ষ্মীমায়ের পূজো করছেন আর চোখের জল ফেলছেন। পূজো শেষে তিনি ভাবলেন, 'সারাদিন কিছুই খাইনি ক্ষিদে পেয়েছে। সবাই এখন রাজবাড়ীতে লক্ষ্মী পুজোর প্রসাদ পাচ্ছেন, আমিও যাই। প্রসাদ পেয়ে আসি।'
তাঁর এমনি কপাল, রাজবাড়ীর দারোয়ানরা তাঁকে দেখেই ধমকে বলে, 'বেটা আবার এসেছিস?' এই বলে তাঁকে গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিলেন। মনের দুঃখে তিনি তাঁর কুটিরের দিকে রওনা হলেন। কুটিরের কাছে আসতেই খুব সুন্দর গন্ধ পেলেন। ঘরের দরজা খুলেই তিনি অবাক! দেখেন সারা ঘরে বিছানো রয়েছে, লাল পাড়ের একখানা শাড়ী আর সুন্দর মিষ্টি গন্ধে ভাঙ্গা ঘর ম ম করছে। -দু চোখে তাঁর জল, তিনি ছুটে গেলেন তাঁর সেই ছোট্ট লক্ষ্মীমায়ের প্রতিমার পায়ের কাছে।
প্রণাম করে মনের আনন্দে কেঁদে বললেন, 'মা! তোমার করুণার অন্ত নেই। আমার মত গরীবের ভাঙ্গা ঘরে এসে সামান্য ক্ষুদকুরা তুমি গ্রহণ করেছ। আবার ঘরে লাল পাড়ের কাপড় বিছিয়ে, তুমি যে এসেছিলে তার প্রমাণ রেখে গেছ।'
-সমস্ত অপমান আর না খেতে পাওয়ার দুঃখ ভুলে, আনন্দে মায়ের মহিমা চিন্তা করতে করতে কখন যে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন খেয়াল নেই।
পূর্ণিমার রাত। মাঝ আকাশে রূপোর থালার মত চাঁদ ঝলমল করছে। এমনি এক সময় লোকজনের ডাকা ডাকিতে তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল। দরজা খুলেই দেখেন, চারদিকে মশালের আলো। রাজা তার দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে দেখেই রাজামশাই তাঁর পা জড়িয়ে ধরেন। তখন তিনি তাড়াতাড়ি রাজাকে উঠিয়ে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করেন, 'রাজা মশাই! কি হয়েছে? আপনি এত রাত্রে?' শুনে রাজা বললেন, 'রাত্রে মা লক্ষ্মী স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছেন, রাজার বাড়ী আজ তিনি আসেন নি। নদীর ধারে, মাঠের কোনে যে ভিক্ষুক থাকে তাঁর ঘরের পূজো গ্রহণ করেছেন।
আমি মা লক্ষ্মীকে জিজ্ঞাসা করি, 'মা! আমাদের কোন অপরাধে আজ আপনি রাজবাড়ী আসেন নি।' শুনে মা বললেন, 'যে গরীব লোকটাকে ভিখারি ভেবে রাজবাড়ীর দারোয়ানরা দু' বার তাড়িয়ে দিয়েছে, সে আমার পরম ভক্ত। তোমার লোক তার মনে দুঃখ দিয়েছে।
তাই রাজবাড়ীর রাজভোগ আর রাজঐশ্বর্য্যের পূজো গ্রহণকরতে আমি আসিনি। তার সামান্য উপাচার আর ভক্তির পূজো আমি গ্রহণ করেছি।' রাজা আরও বললেন, 'লক্ষ্মীমায়ের কাছে বার বার ক্ষমা চাওয়ায় মা বললেন, 'শোন রাজা। তুমি তার কাছে গিয়ে, তার পা ধরে ক্ষমা চাও। সে যদি তোমায় ক্ষমা করে আর তুমি যদি তার দুঃখ দূর করে দিতে পার তবেই রাজলক্ষ্মী হয়ে তোমার রাজবাড়ীতে আবার ফিরে আসবো।' 'সেই অপরাধের ক্ষমা চাইতেই,' আমি আপনার কাছে এসেছি।' এই কথা বলে রাজামশাই আবার তাঁর পা' ধরে ক্ষমা চাইতে লাগলেন।
তিনি বললেন, 'হ্যাঁ মহারাজ! মায়ের আশীর্বাদে আমার মনে আজ আর কোন দুঃখ নেই। আমি রাজবাড়ীর সবার সব অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছি।'
পরে রাজামশাই তাঁকে অনেক জমি দিলেন। সুন্দর এক বাড়ী করে দিলেন। মা লক্ষ্মীর কৃপায় তাঁর আর কোন দুঃখ কষ্ট রইল না।
(শ্রীশ্রী রামঠাকুরের সাথে সাক্ষাৎ সঙ্গ করার সুযোগ যে সমস্ত ভক্ত পেয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম চট্টগ্রামের স্বর্গত বিধূভূষণ বসু। একবার শ্রীশ্রী রামঠাকুর কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমাতে তাঁর বাড়ীতে ছিলেন। সেই বাড়ীতে সেই সময় ছিলেন তাঁর শ্যালক স্বর্গত বীরেন রায় ও ওনার স্ত্রী। শ্রীশ্রী ঠাকুর বীরেন রায়ের সহধর্মিণীকে বললেন, 'লক্ষ্মী পূজা করবেন না? আজতো লক্ষ্মীপূজা।' বীরে। বাবুর সহধর্মিণী বললেন, 'দেশের বাড়ীতে লক্ষ্মীপূজা হয় তাই এখানে আর তিনি লক্ষ্মীপূজা করবেন না। তাছাড়া তিনি উপোসও করেন নি।'
ঠাকুর তাকে বললেন, 'উপাস না করলে কিছু হয় না। উপাস মানে উপবাস - উপ অর্থাৎ নিকটে, বাস মানে থাকা। ভগবানের নিকটে থাকাই হইল উপবাস। না খাইয়া থাকলে ভগবানের কাছে থাকা হয়না নাম করলেই তার কাছে থাকা হয়। উপাস করেন নাই তাতে কী হইছে লক্ষ্মীপূজা করেন গিয়া, লক্ষ্মীপূজা করা ভাল, সত্যনারায়ণের পূজাও হইবো, কত লোকে প্রসাদ পাইবো।' এই কথা বলে ঠাকুর লক্ষ্মী পূজার
মাহাত্ম্য সম্বন্ধে এই গল্পটি বলেছিলেন। লেখিকার ভাষায়, 'এই ঘটনার বর্ণনার সময় দরিদ্র ভিক্ষুকটির দুঃখে ঠাকুরের কণ্ঠস্বর ভারাক্রান্ত ও নয়ন যুগল অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিয়া ছিল।'
......আকর গ্রন্থ শবরী)
[- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাড়ী তৈরীর সিমেন্ট, লোহা ইত্যাদির অপ্রতুলতা সত্বেও এই স্বর্গত বীরেন রায়ের অনলস তত্বাবধানে ১৯৪২ খ্রীষ্টাব্দে যাদবপুর অঞ্চলে নির্মিত হয় শ্রীশ্রী কৈবল্যধামের আদি মন্দির।]
উপদেশ: 'উপোস মানে উপবাস উপ অর্থাৎ নিকটে, বাস মানে থাকা। ভগবানের নিকটে থাকাই হইল উপবাস। না খাইয়া ভগবানের কাছে থাকা হয়না নাম করলেই তার কাছে থাকা হয়।' বলেছিলেন শ্রীশ্রী রামঠাকুর।
বেদবাণী: 'সত্যং পরম্ ধীমহি। সর্বদা নাম করিবেন। নামই চিরকাল অচল শক্তি দান করেন। নামই সত্য, নাম দিয়া সকল পূজা করিতে হয়। নামই মহামন্ত্র, নাম বই আর কিছুই নাই।'
(বেদবাণী ২য় খন্ড পত্র ৮১)
পূজা কাহাকে বলে? আপন কর্তৃত্বাভিমান সহ সকল ইন্দ্রিয়, ইচ্ছা বাসনাদি সকল দান
করাকে।'
(বেদবাণী ৩য় খন্ড পত্র ৫৮ [৫])
'বাহ্যিক উপকরণ ব্যতীত ভগবানের পূজা অথবা তাঁহাকে পাওয়া যায় কি না এবং তাহা কি উপায়ে পাওয়া যায়?
-অন্তরের সুখকর ইচ্ছা বর্জিত হইলেই ভগবানের পূজা হয়। পতিসেবাই পূজা হয়......
(বেদবাণী ৩য় খন্ড ৫৮ [৭])

0 Comments