রাম ঠাকুরের কথা

 রাম ঠাকুরের কথা

🌹
আরও মনে পড়িতেছে যে ঠাকুর সেবাধর্ম সম্বন্ধেও কিছু আলোচনা করিয়াছিলেন। এখানেও স্মরণ রাখিতে হইকে যে অনন্য ও নিরপেক্ষ না হইলে প্রকৃত সেবাধিকারী হওয়া যায় না। এ সম্বন্ধে ঠাকুর একটি গল্প বলিতেন, কথাটা বিশদ করিবার জন্য সেই গল্পটি এখানে বিবৃত করিব। কৃষ্ণভক্ত নারদ বীণা বাজাইয়া অহর্নিশি হরিগুণ গান করিয়া মহানন্দে কাল যাপন করেন, তথাপি তাঁহার একটা ক্ষোভ আর কিছুতেই যাইতে চাহে না। তিনি বরাবরই লক্ষ্য করিয়াছেন যে প্রভুর নিকট ব্রজগোপীদিগের যে আদর, তাহা তিনি কোনদিনই লাভ করিতে পারিলেন না। এমনও কখন কখন তাঁহার মনে হইত যে ইহাতে প্রভুর অবিচার ও পক্ষপাতিত্বই সূচিত হইতেছে। ইহা অতি সাংঘাতিক চিন্তা। এরূপ চিন্তা স্থায়ী হইলে নারদের পতন অবশ্যম্ভাবী, অথচ তিনি একজন প্রকৃত ভক্ত ও সাধক, এই জন্যই নারদের প্রতি কৃপাপরবশ হইয়া শ্রীকৃষ্ণ তাঁহার ভুল ভাঙ্গাইয়া দিতে ইচ্ছা করিলেন। ঘুরিতে ঘুরিতে নারদ একদিন মথুরায় আসিয়া উপস্থিত। সেখানে আসিয়া শুনিলেন যে কিছুদিন যাবৎ শ্রীকৃষ্ণ শীরঃপীড়ায় অত্যন্ত কষ্ট পাইতেছেন, তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করা সম্ভব হইবে না। নারদ কথাটা সহসা বিশ্বাস করিতে পারিলেন না, প্রভুর অসুখ, এও কি সম্ভব? অনেক অনুনয় বিনয় করিয়া তিনি প্রভুর সাক্ষাৎকারের অনুমতি পাইলেন এবং শ্রীকৃষ্ণের নিকট উপস্থিত হইয়া দেখিলেন যে বাস্তবিকই তিনি দুই হাতে মাথা চাপিয়া ধরিয়া বিছানায় শুইয়া রহিয়াছেন এবং যন্ত্রণায় ছট্‌ফট্ করিতেছেন। নারদ নিজ চক্ষুকে বিশ্বাস করিতে পারিলেন না। এ তিনি কি দেখিলেন, এ যে স্বপ্নেও অগোচর। নারদ অস্থির হইয়া পড়িলেন। যাহাই হউক; একটু প্রকৃতিস্থ হইতেই তিনি শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করিলেন: "এই ব্যাধির কি কোন প্রতিকার নাই?” শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন: "আছে এবং তাহা অতি সহজ। কোন ভক্ত যদি তাহার পায়ের ধূলা আমার মাথায় দিতে পারে তাহা হইলেই এই অসুখ সারিয়া যায়।” এই কথা বলিয়া শ্রীকৃষ্ণ নারদের নিকটেই তাঁহার একটু পায়ের ধূলা প্রার্থনা করিয়া বসিলেন। নারদ ভয়ে ও বিস্ময়ে একেবারে আৎকাইয়া উঠিলেন। কি সর্ব্বনাশ, প্রভু বলেন কি, আমি দিব তাঁহাকে পায়ের ধূলা! প্রকাশ্যে বলিলেন: "এ কি বিপরীত আদেশ করিতেছেন প্রভু! আমি আপনার দাসানুদাস, আমার সঙ্গে এরূপ পরিহাস কি আপনার সাজে?” তদুত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন যে নারদ যদি নিজে দিতে না-ই পারেন, তাহা হইলে তিনি অন্য কাহারও নিকট হইতে তাঁহার জন্য একটু চরণধূলা আনিয়া দেয়, চরণধূলা ছাড়া এই রোগের উপশম হইবে না, ইহা নিশ্চিত। নারদ বাহির হইলেন, ত্রিভুবনের প্রায় সর্বত্রই ঘুরিলেন কিন্তু চরণধূলা কোথাও মিলিল না। ব্রহ্মা, মহাদেব, দেবতাগণ, যক্ষ, কিন্নর প্রভৃতি সকলেরই এক কথা। "এ কি সাংঘাতিক কথা! প্রভুকে পায়ের ধূলা দিলে নরকেও যে আমার স্থান হইবে না। আপনি দেবর্ষি নারদ, ধৰ্ম্মজ্ঞ, মহাভক্তিমান, এ কি ভয়াবহ প্রস্তাব লইয়া উপস্থিত হইয়াছেন,” ইত্যাদি, ইত্যাদি, পায়ের ধূলা কেহই দিল না। নারদ মহা মুশকিলে পড়িলেন, শূন্য হাতে প্রভুর নিকট ফিরিয়া যাইতেও পারেন না, অথচ কি করিয়া যে চরণধূলি সংগ্রহ করিবেন তাহাও ভাবিয়া পাইলেন না। আন্তরিক বিরাগবশতঃই হউক, অথবা অন্য যে কোন কারণেই হউক, এতক্ষণ তাঁহার ব্রজগোপীদিগের কথা স্মরণ হয় নাই, কিন্তু এইবার বিপাকে পড়িয়া হঠাৎ তাঁহাদের কথা মনে হইল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বৃন্দাবনে যাইয়া উপস্থিত হইলেন। নারদকে দেখিয়া গোপীগণ অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন এবং সকলে প্রায় একযোগে শ্রীকৃষ্ণের কুশল বার্তা জিজ্ঞাসা করিলেন। নারদের মুখে তাঁহার অসুখের কথা শুনিয়া গোপীগণ অত্যন্ত মর্মাহত হইলেন এবং বিষাদ-কাতর বদনে, এই রোগোপশমের উপায় কিছু আছে কিনা, নারদকে জিজ্ঞাসা করিলেন। নারদ যখন বলিলেন যে একটু পায়ের ধূলা পাইলেই রোগ সারিয়া যায় তখনই তাঁহাদের মুখ হাস্যোজ্জ্বল হইয়া উঠিল এবং তাঁহারা একযোগে সকলেই নারদের দিকে পা বাড়াইয়া দিলেন। নারদ বিস্ময়ে হতবাক্ হইয়া গেলেন। এ কি আশ্চর্য্য ভগবৎপ্রীতি, ইহা তো বাস্তবিকই আর কোথাও নাই। নারদের ভুল ভাঙ্গিয়া গেল এবং তাঁহার মনেও আর কোন ক্ষোভ রহিল না। তিনি বুঝিতে পারিলেন যে তাঁহার ও অন্যান্য সকলের ভগবৎপ্রীতি আত্মপ্রীতিরই নামান্তর, স্বকীয় শুভাশুভই তাহার মান। নিজের অনিষ্টাশঙ্কায় প্রভুর নিতান্ত প্রয়োজনীয় বস্তুটি কেহই দিতে পারিলেন না। কিন্তু ব্রজগোপীদের মনে কোন প্রশ্নই উঠিল না, কারণ তাঁহাদের কৃষ্ণপ্রীতি শুধু কৃষ্ণপ্রীতিই, আত্মপ্রীতির গন্ধও সেখানে নাই।
জয় শ্রীশ্রী রাম ঠাকুর।
লেখক: ডক্টর শ্রী ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

Post a Comment

0 Comments