পতিব্রতা ধর্ম্মকেই ব্রজবাস বলিয়া জানিলে মনের চঞ্চলতা অভাব থাকে না।
কারণ সর্ব্বদাই অষ্টকাল সত্যস্বরূপ ভগবান লীলা প্রভাবে ধীরা, স্থিরা, গম্ভীরা রসে ডুবিয়া থাকেন।
মনের স্বভাব ও চঞ্চলতার রহস্য
সেই লীলার প্রেমরস তরঙ্গে টলমল হইয়া মনও চঞ্চল রসে উথলিয়া ভাসে।
এই মনকে জোর করে স্থির করিবার চেষ্টা করিতে নাই।
কারণ মনের স্থিরতা ক্ষণিক শান্তি দিলেও, ইহা সংসারের বন্ধন সৃষ্টি করে।
ইন্দ্রিয় ও সুখ-দুঃখের চক্র
মনই ইন্দ্রিয়ের অধিপতি। ইন্দ্রিয় সীমাবদ্ধ বলিয়াই সুখের অন্তে দুঃখ এবং দুঃখের অন্তে সুখ আসে।
এই দ্বন্দ্বে আবদ্ধ থাকিলে ব্রজবাস হয় না।
দেহ অভিমান ও মুক্তির পথ
যতক্ষণ দেহ অভিমান থাকে, মন চঞ্চল থাকিবে।
দেহ অভিমান দূর হইলে সাবিত্রীর শক্তিতে পতি অনাবরণে প্রকাশিত হন, যিনি বেদে নিত্য সত্যবান ভগবান বলিয়া পরিচিত।
সীতা ও অশোকবনের উপমা
জীব যখন পতিসেবা ভুলিয়া অনিত্য সুখের আশায় মায়ামৃগের পশ্চাতে ধায়,
তখন সীতার ন্যায় অশোকবনে চেড়ীদের প্রলোভন ও শাসনে কষ্ট পায়।
সংসার — সুখ ও দুঃখের তরঙ্গ
এই সুখের অভাবই দুঃখ এবং দুঃখের অভাবই সুখ।
এই প্রকার চেড়ীর উৎপাতকেই সংসার বলা হয়।
পতিসেবা — মুক্তির একমাত্র উপায়
এই সংসার তরঙ্গ হইতে উদ্ধার হওয়ার একমাত্র পথ হইল ধৈর্য্যসহ পতিসেবা।
পতিসেবায় তৎপর থাকিলে পতি অনাবরণে প্রকাশিত হইয়া জীবকে উদ্ধার করেন।
আদর্শ নায়ক-নায়িকা
এই ধর্ম্মের নায়ক-নায়িকাগণ পতিসেবার পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া পথ খুলিয়া গিয়াছেন।
সত্য ধর্ম্ম কী?
পতিসেবাই প্রকৃত ধর্ম্ম। ইন্দ্রিয় সুখের অনুসন্ধান কখনই ধর্ম্ম নয়।
নামস্মরণ ও চেতনার শুদ্ধি
পতি সর্ব্বদাই অকলুষ, যেমন সূর্য্য মেঘে আচ্ছন্ন হইলেও মলিন হয় না।
তেমনি পতি কখনো কলুষিত হন না।
যদি সর্বদা হৃদয়ে পতি দেবতাকে ধারণ করা যায়, তবে কোন মেঘ বা নিন্দা আচ্ছন্ন করিতে পারে না।
শেষ বাণী
অতএব, সর্ব্বদা নাম করিবেন — এই নামই মুক্তির পথ।
বেদবাণী তৃতীয় খণ্ড (৫৬)নং পত্রাংশ ,শ্রীশ্রীরামঠাকুর। ”সত্যং পরম ধীমহি” শ্রুতির বাক্য। পতিব্রতা ধর্ম্মকেই ব্রজবাস বলিয়া জানিলে মনের চঞ্চলতা অভাব থাকে না, কারণ সর্ব্বদাই অষ্টকাল সত্যস্বরুপ ভগবান লীলা প্রভাবে ধীরা স্থিরা গম্ভীরা রসে ডুবিয়া থাকেন। সেই লীলার প্রেমরস তরঙ্গে টলমল হইয়া চঞ্চল রসে মনও চঞ্চল তরঙ্গে উথলিয়া ভাসে এবং বেড়ায়। সেই মন স্থির করিবার জন্য চেষ্টা করিতে নাই। কারণ মনের স্থির দ্বারা আদি শান্তির বৃদ্ধি হয়, ইহার স্থিতি সংসারেরই বন্ধন, কারণ………মাত্র সুখ পাওয়া যায়, মনের সুখ স্থিতি থাকে না, গতিশীল [?]যেহেতু মনই ইন্দ্রিয় অধিপতি। ইন্দ্রিয়সকল মাত্রা সীমাবদ্ধ বলিয়াই সুখের অন্তে দুঃখ , দু:খের অন্তে সুখ ইহাই হয়, ব্রজ ছাড়িয়া পড়িয়া যায়, ব্রজে বাস হয় না। এইজন্য মনকে সর্ব্বদাই চঞ্চল হইতে দিবে যে পর্য্যন্ত দেহ অভিমান থাকে। দেহ অভিমান যখন চলিয়া যায় তখন সাবিত্রীর শক্তিতে অনাবরণ পতি যাহাকে বেদে নিত্য সত্যবান, ভগবান বলিয়া প্রকাশ হয় (?)। মনের দ্বারা অভিমানী হইয়া জীবভাবে হ্রস্ব, দীর্ঘ, প্লুত তিনটি অবস্থা হয়। তদ্দ্বারা অভিমানী হইয়া জীবগণ পতিসেবা ভুলিয়া মায়ামৃগ অর্থাৎ অনিত্য সুখের প্রত্যাশিত [হইয়া] সীতা যে পবিত্র…….. অশোকবনের চেড়ীর দৌরাত্মে পড়িয়া বৃথা চিন্তায় মন চঞ্চলতা-বশত: সুখদু:খের তরঙ্গায়িত হইয়া কষ্ট পায়। এইজন্য রাবণের অশোক বনে সীতা আটক থাকিয়া চেড়ীদের প্রলোভন (ঐহিক সুখ ভোগ) শাসন (ঐহিক দুঃখ ) বোধ করে। এই সুখের অভাবই দুঃখ এবং দু:খের অভাবকেই সুখ আখ্যা হয়। এই প্রকার চেড়ীর উৎপাত বিষয়গণকে সংসার বলে। এই সংসারের যত বেগ সমস্তই ভাগ্যানুসারে হয়, কারণ পতিসেবা ভুলিয়া অভিমানের সেবায় যোগ দিয়া থাকাতে হইয়াছে। অতএব ঐ তরঙ্গ হইতে উদ্ধার হওয়ার একমাত্র ধৈর্য্য ধরিয়া পতিসেবা করিতে করিতে পতি অনাবরণে প্রবেশ করিয়া উদ্ধার করিয়া লয়, যত বাধক সকলকে সংহার করিয়া। এই ধর্ম্মের নায়কনায়িকাগণ পতিসেবার পরাকাষ্ঠা পথ নিদর্শন করিয়া খুলিয়া দিয়া রাখিয়াছেন। এই পতিসেবাই ধর্ম্ম, ইন্দ্রিয়ের সুখ অন্বেষণ ধর্ম্ম নয়। অতএব সর্ব্বদা সকল বাসনার বেগ ধৈর্য্য ধরিয়া পতিসেবায় তৎপর থাকিবার চেষ্টাই উপাসনা। পতি সর্ব্বদাই অকলুষ থাকেন, যেমন সূর্য্য মেঘাচ্ছন্ন হইলেও মলিন হয় না। সেইরুপ পতিকে কেহ নিন্দা করিলেও পতি কলুষিত হ’ন না। নিন্দা সকলই পতিসেবাপরায়ণ সতীর প্রভাবে নিন্দাস্বরুপ যে মেঘ তাহা ভস্ম হইয়া গিয়া পতি নির্ম্মল জ্যোতি-প্রভা জ্যোতির্ম্ময় আনন্দকারী শক্তিশালী হয়। সর্ব্বদাই পতি দেবতা হৃদয়ে রাখিয়া দিলে কোনরুপ মেঘে আচ্ছন্ন করিতে পারিবে না। কেবল নাম করিবেন।
0 Comments