পরম প্রেমময় শ্রীশ্রী রাম ঠাকুর — লীলা অমৃত
💥💥 "বড় ভাল আম, বড় মিষ্ট আম সুধীর আনছে।” — সুধীচরন্দ্র সরখেল কর্তৃক তেতো আম নিবেদন
"দম্ভের দান, দণ্ডের সমান।" 🌹🌹 (৫)
স্বর্গীয় সুধীরচন্দ্র সরখেল মহাশয় তখন স্বগ্রামে ফরিদপুর জেলার মাঐসার গ্রামে বাস করতেন। পড়াশুনার পাট শেষ হয়েছে অনেকদিন। লক্ষ্মীর কৃপালাভের জন্য রুদ্ধদ্বারে কপাল খুঁড়ছেন বারংবার। কিন্তু বেকারত্ব ঘোচেনি এতটুকুও। বলিষ্ঠ যুবক তিনি, অহোরাত্র অক্লান্ত পরিশ্রম করতেও তিনি সদা প্রস্তুত। কিন্তু পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। সংসারের যা অবস্থা তাতে কিছু ঘরে আনা তাহার নিতান্ত প্রয়োজন। লেখা-পড়া যা শিখেছেন তাতে চাকুরী পাওয়া দুষ্কর, ব্যবসা করবেন তার মূলধন কৈ?
জ্যৈষ্ঠ মাসের এক সকালবেলা তিনি বাড়ীর উঠানে অসহিষ্ণু হয়ে পায়চারি করছিলেন। তাহার এই নৈস্কর্ম্য অসহনীয় জ্বালার চেয়েও দুঃসহ। ভিন্ন গ্রামের তাহারই এক সমবয়সী এসে সংবাদ দিল, রামঠাকুর মহাশয় পার্শ্ববর্তী গ্রামে এসেছেন। সুধীরচন্দ্রের যদি সাক্ষাতের ইচ্ছে বিন্দুমাত্র থাকে তাহলে তিনি যেন তক্ষুণি চলে যান। ঠাকুরমহাশয়ের কথাটা কানে আসতে সুধীরচন্দ্রের মাতা ওদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ঠাকুর মহাশয়ের আগমন বার্তায় সুধীরচন্দ্রের মাতা যেন নতুন উষার আলো দেখতে পেলেন। মনে মনে ভাবলেন, ঠাকুরের পাদস্পর্শে সুধীরচন্দ্রের জীবনের দুঃখ-নিশার হয়ত অবসান হবে।
অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন সুধীরচন্দ্রের মাতা, বিরক্তি-ভরা কণ্ঠে বললেন, "ঠাকুর এসেছেন, খবর পেয়েছিস্, অথচ তুই সেই পায়চারিই করে যাচ্ছিস। তোর দুর্ভাগ্য দূর হবে কিসে? যা ইচ্ছা কর।" বলে তিনি রাগত ভাবে রান্না ঘরে চলে গেলেন। এতক্ষণ সুধীরচন্দ্র যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেননি। মা রান্নাঘরে যাওয়ায় সে পথ প্রশস্ত হলো। সুপারি বেচার টাকাকড়ি সুধীরচন্দ্রের মাতা একটা মাটির হাঁড়িতে রাখতেন। ইতিপূর্বে যতবার গিয়েছেন ঠাকুর মহাশয়ের দর্শনে, প্রতিবারই তিনি ঐ হাঁড়িতে হাত ঢুকিয়ে এক মুঠো পয়সা নিয়ে যেতেন। কারণ উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুর মহাশয়ের পক্ষে যাহা অস্বাভাবিক তাই করতেন; বলতেন-"সুধীর আমার লাইগ্যা কী আনছো?" পকেট থেকে একমুঠো পয়সা বের করে নবীন যুবক সুধীরচন্দ্র বীরদর্পে ঠাকুর মহাশয়ের চরণে রাখতেন। ঠাকুর মহাশয়ও সঙ্গে সঙ্গে ঐ পয়সা "হরির লুট" দিতেন। উপস্থিত সকলে সানন্দে সেই পয়সা কুড়িয়ে নিতেন। একরকম চৌর্যবৃত্ত অবলম্বন করে সংগৃহীত যে পয়সা-কড়ি তিনি ঠাকুরের চরণে রাখতেন তা পাঁচজনে কুড়িয়ে নিতো। বেদনা-বোধ তাহার পক্ষে তখন খুবই স্বাভাবিক ছিল। একবার এই অবস্থায় পাঁচজনের সঙ্গে তিনিও হরির-লুটের কয়েকটা পয়সা কুড়িয়ে নিলেন। তখন ঠাকুর মহাশয় তাকে ঐ পয়সা অন্যকে দিয়ে দেওয়ার জন্য বললেন। ক্ষুন্নমনে সুধীরচন্দ্র ঠাকুর মহাশয়ের কাছে জানতে চাইলেন, সকলেই তো হরির-লুটের পয়সা নিচ্ছেন, তার বেলার বাধা দিচ্ছেন কেন ঠাকুর। সস্নেহে ঠাকুর মহাশয় বললেন,
"গুরুকে দান করা ধন কিছু নিতে নাই, গুরুর কাছে কিছু চাইতেও নাই।"
স্তব্ধচিত্তে সুধীরচন্দ্র তার মুঠোর পয়সা স্নান মুখে অন্যকে দিয়ে দিলেন। ঠাকুরমহাশয়ের মুখে "তুমি" শব্দ কদাচিৎ উচ্চারিত হ'ত। দূর সম্পর্কে সুধীরচন্দ্র ঠাকুরের নাতি হতেন। সে কারণেই ঠাকুর মহাশয় তাকে "তুমি" বলতেন আর সুধীরচন্দ্র বলতেন, ঐ সম্পর্কটা একটা লতা-পাতার গন্ধ-মাত্র।
এবারও ঠাকুরের আগমন সংবাদ পেয়ে ঐ মাটির হাঁড়িতে হাত ঢোকালেন। কিন্তু বিধি প্রসন্ন নয়। হাঁড়িটি শূন্য একটি কানাকড়িও সেখানে নেই। শুধু হাতে ঠাকুর সন্দর্শনে যান কী করে? নিজেকে একান্তভাবেই অসহায় বোধ করছিলেন সুধীরচন্দ্র। জ্যৈষ্ঠ মাসের দিন, বাড়ীর আমগাছের আম অনেকদিন পূর্বেই তারা নিঃশেষে খেয়ে নিয়েছেন। আশপাশের অনেক বাড়ীতেই এখনও অনেক রয়েছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে চাওয়ার উপায় নেই। গ্রাম্য বিরোধ ও দলাদলিই প্রবল অন্তরায়। রান্নাঘর থেকে his মাতা আবার ঝঙ্কার দিয়ে উঠলেন, "তুই এখনও দাঁড়িয়ে আছিস, গেলি না, পোড়া কপাল আমার।" আর তো থাকা যায় না। সুধীরচন্দ্র নিরুপায় হয়ে পথে বেরিয়ে পড়লেন। ভাবলেন, ঠাকুর মহাশয় তার অসহায় অবস্থার সবকিছুই জানেন। সুতরাং শুধু হাতেই আজ প্রণাম করবেন তাঁকে।
অতি দ্রুত চরণে গ্রাম্য পথ দিয়ে চলেছেন। সুধীরবাবু। হঠাৎ কী একটা পতনের শব্দ তার কানে এল পিছন দিক থেকে। কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে আবার সুধীরবাবু পিছিয়ে এলেন, পেলেন একটা সদস্যপতিত বড় আম। আনন্দ-উজ্জ্বল হয়ে উঠল সুধীরবাবুর মুখচোখ। এবার তো আর শুধু হাতে ঠাকুরের কাছে যাওয়ার জন্য সংকোচ বোধ করতে হবে না- আমটি তার মহা-সম্বল। পথপার্শ্বে এক পুষ্করিণীর জলে আমটিকে তিনি সযত্নে খুলেন, নিজের কোঁচার কাপড়ে পুঁছে নিয়ে প্রচন্ড গ্রীষ্মের অগ্নি-ঢালা পথে আবার হন হন করে হাঁটতে লাগলেন।
ঠাকুর মহাশয় যে ঘরখানায় বসেছিলেন তার সামনে উপস্থিত হতেই সুধীরবাবু দেখলেন ঘরে অনেক নরনারী বসে রয়েছেন। ঠাকুর মহাশয় বলে উঠলেন, "সুধীর আইছে, সুধীর আইছে।" সুধীরবাবু আমটি ঠাকুরের পাশে রেখে প্রাণভরে প্রণাম করলেন ঠাকুরের দুই চরণে। ঠাকুর মহাশয় গৃহকত্রীকে বললেন, এই আমটা ধোয়া আছে। কেটে সকলকে সমানভাবে বন্টন করেন। একখানা বড় থালায় আমটি কেটে এনে ঠাকুরমহাশয়ের সামনে রাখলেন গৃহকর্ত্রী। ঠাকুরমহাশয় এক টুকরো তুলে নিলেন। বাকী অংশগুলি সকলের মধ্যেই সমভাবে পরিবেশিত হল। এক সঙ্গে সঙ্গে অনেক কন্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠল- "উঃ কী তেতো আম!" সকলেই বাইরে গিয়ে আমের অংশগুলি ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন। সুধীরবাবুও চীৎকার করে উঠলেন, "এ তেতো আম-ঠাকুর মহাশয়, শিল্পির ফেলে দিন।" কিন্তু কাহারও কথায় ঠাকুর মহাশয় নিরস্ত হলেন না, আমের চিলতেটুকু চাটছেন আর স্নেহভরা কন্ঠে বলছেন, "না বড় ভাল আম সুধীর আনছে। মিষ্ট, খুব মিষ্ট।"
ক্ষিপ্ত হয়ে সুধীরচন্দ্র ঠাকুর মহাশয়ের হাতখানা ধরতে এলেন তাঁকে প্রতিনিবৃত্ত করার জন্য। কিন্তু স্নেহসুধামাখা কণ্ঠে ঠাকুর মহাশয় আবার বললেন, "বড় ভাল আম, বড় মিষ্ট আম সুধীর আনছে।” ঠাকুর মহাশয় পুনরায় চিলতেটুকু চাটতে লাগলেন। এতক্ষণের রুদ্ধ অশ্রুধারাকে আর রুখতে পারলেন না সুধীরচন্দ্র। বাড়ী ফেরার পথে তার বুঝতে বেশী বিলম্ব হল না, অক্ষমের উপহার বলেই যে আম তেতো বলে অন্য সকলে এবং তিনি নিজেও ফেলে দিয়ে পরিত্রাণ পেলেন, শুধু ঠাকুর মহাশয়ই সেই আম দীর্ঘ সময় ধরে চাটলেন।
সামর্থ্যহীনের দেওয়া বলেই কি আমের এত দাম। তাহার দারিদ্র্যই কি ঠাকুরকে তেতো আমে তৃপ্ত করল। ক্ষতের বেদনাবোধেই তাকে সারাটা পথ চোখের জল ফেলতে ফেলতে যেতে হয়েছিল।
কালচক্র কখনও বসে থাকে না। সে চির গতিমুখর। চাকা যখন মেদিনী স্পর্শ করে তখন কেহ হয় পৃষ্ট আবার সেই চাকাই যখন উপরে উঠল তখন কেহ হয় হৃষ্ট। শুরু কৃষ্ণ দুই পক্ষ বিস্তৃত করে কালবিহঙ্গম কালান্তরে প্রবেশ করে। মাঐসারের সেই বেকার যুবক সুধীরচন্দ্র আজ কটকের একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সরকারি ঠিকাদার। বয়স তখন তার পঁচিশের কিছু নীচে। ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্স পঞ্চাশ হাজারের উর্ধ্বে। মংলাবাগে তার বাসভবনের একটা বড় অংশে তার অফিস। সকালে-বৈকালে বিশ-পঞ্চাশ জন রাজমিস্ত্রী বসে থাকে। বাড়ীটা দিন-রাত গণম্ করছে লোকের আসা যাওয়ায়। বাড়ী থেকে এক কপর্দকও না নিয়ে এসে শুধু নিজের পরিশ্রমে তিনি আজ প্রভাবশালী পুরুষ।
সেদিন সকালবেলা সুধীরচন্দ্র কূয়োর কাছে মুখ ধুচ্ছিলেন। একাউনটেন্টবাবু এসে জানালেন, একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক তাহাকে খোঁজ করছেন। মুখ ধুতে ধুতে সুধীরবাবু বললেন, নামটা কী আগে জিজ্ঞাসা করে এসো। ঘুরে এসে তিনি জানালেন, বুড়ো ভদ্রলোক বললেন, তাঁর নাম "রাম"।
ঘটিটা একপাশে রেখে মুখ ধোয়া অসমাপ্ত অবস্থায় ঊর্ধ্বাশ্বাসে একাউনটেন্টবুর ঘরে এসে প্রবেশ করলেন সুধীরচন্দ্র-আকুল হয়ে প্রণাম করলেন ঠাকুর মহাশয়ের চারু-চরণ দু'খানি। নিজ-শয্যায় চাদর পাল্টালেন, পাল্টালেন বালিশ দু'টি। ঠাকুর মহাশয়কে নিয়ে এসে সেই শয্যায় বসালেন। সহসা সুধীরবাবুর স্মরণ হল, এটাও জ্যৈষ্ঠ মাস, দীর্ঘ পোষিত তার চিত্তের যে ক্ষতস্থান তা নিশ্চিত তিনি নিশ্চিহ্ন করতে পারবেন। ঠাকুর মহাশয়ের কাছে অনুমতি নিয়ে আধ ঘন্টার জন্য তিনি বের হলেন। যাবার আগে ঠাকুরের একাকীত্ব ঘুচাবার জন্য একটা চার বছরের পুরান পঞ্জিকা ঠাকুর মহাশয়ের হাতে দিয়ে গেলেন। এরমধ্যে তিনি বাজার ঘুরে কটকের যা যা শ্রেষ্ঠ আম তা কিনলেন-বারো ঝুড়ির মত হবে। একটা ঠেলাগাড়ী করে নিয়ে এলেন। ঠেলাগাড়ীর মুটেরাই ঝুড়িগুলো মাথায় করে এন রাখল ঠাকুর মহাশয়ের ঘরে। ঘরখানা অর্দ্ধেক ভরে গেল আমের আর সারা ঘর ভরপুর হয়ে গেল অমৃতফলের সুগন্ধে। মুটেরা এলো গেলো কতবার। আমের ঝুড়ি রাখার শব্দ হল অথচ পুরান পঞ্জিকায় নিবদ্ধ দৃষ্টি তুলে ঠাকুর মহাশয় একবার ফিরেও তাকালেন না। সুধীরবাবুর একটু বের হবার বিশেষ প্রয়োজন। বের হবার আগে ঠাকুরকে একটু আম খাইয়ে যেতে চান। ঘাম পুছে সুধীরবাবু বিনীতভাবে বললেন, সর্বশ্রেষ্ঠ আম তিনি এনেছেন। কয়েকটি আম তিনি কেটে আনবেন কি? ঠাকুর মহাশয়ের প্রসাদ পেয়ে তিনি কর্মস্থলে যাবেন। মুখ তুলে ঠাকুর মহাশয় শুধু বললেন, "এখন থাক"।
ঠাকুর মহাশয়কে না দিয়ে ঐ আম তিনি খান কী করে। রাঁধুনীর তৈরী জলখাবার খেয়ে সুধীরবাবু কর্মস্থলে চলে গেলেন। দ্বিপ্রহরে ফিরে এসে স্নান শেষে সুধীরবাবু আবার আম কাটতে উদ্যাত হলেন। ঠাকুর মহাশয় আবার তাকে নিরস্ত করে বললেন, "এখন থাক"। রাত্রিতেও সুধীরবাবু অনুরূপ অনুরোধ করেছিলেন। ঠাকুর মহাশয় ও একই উত্তর দিয়েছিলেন, "এখন থাক"। প্রতিদিনই ঠাকুরের কাছে কিছু কিছু নরনারী আসতেন। কিন্তু ঠাকুরমহাশয় গ্রহণ না করলে এ আম অন্যকে তিনি দেন কী করে বা নিজেই গ্রহন করেন কীরূপে। দ্বিতীয় দিনও প্রথম দিনের মতোই হল। যখনই ঠাকুর মহাশয়কে অনুরোধ করেন, ঠাকুর মহাশয় তখনই উত্তর দেন, "না এখন থাক"। আরও বলেন, রাধুনী মা তাঁহাকে দুধ দিয়েছিলেন তাতে তাঁর ভরা-পেট। আর জায়গা নাই।
কটকের দৃশ্য, বিশেষ করে জ্যৈষ্ঠ মাসে, দুঃসহ। আশঙ্কা হচ্ছিল সুধীরচন্দ্রের বাজার উজার করে তিনি যে ঝুড়ি ঝুড়ি শ্রেষ্ঠ আম এনেছেন সে না পচে যায়। আবার আশায় বুক বাঁধেন, কাল হয়ত ঠাকুর আম গ্রহন করবেন। পরে তিনিও আম খেতে পারবেন এবং পাঁচজনকেও উদার হস্তে পরিবেশন করতে পারবেন।
তৃতীয় দিনে সকালবেলায় অতি করুণ-কাতর-কণ্ঠে সুধীরবাবু আম কাটার অনুমতি চাইলেন। পঞ্জিকার থেকে তেমনি দৃষ্টি না সরিয়ে ঠাকুর মহাশয় আগের মতোই বললেন, "না এখন থাক।" এবার ভেঙ্গে পড়লেন সুধীরচন্দ্র। আকুল হয়ে বললেন, কিছু কিছু পচা গন্ধ আজ পাওয়া যাচ্ছে। এরপরে এই সব আম রাস্তায় ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোন পথ থাকবে না। তেমনি দৃঢ়-কণ্ঠে ঠাকুর মহাশয় বললেন, "এখন থাক।"
দ্বি-প্রহরেও সুধীরচন্দ্রের অনুরোধ পূর্বের ন্যায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল-ঠাকুর মহাশয় সম্মত হননি। সায়াহ্নে আরও কয়েকজনের উপস্থিতিতে এক এক করে ঝুড়িগুলো খোলা হল। পচন ক্রিয়া আমের উপর প্রচন্ড হয়ে উঠেছে। সবকটা ঝুড়ি টেনে ফেলে দিতে হয়েছিল রাস্তায়। এক চিলতেও আম মুখে তোলেননি ঠাকুর মহাশয় এবং সে কারণেই অন্য কেহও আম এতটুকু খেতে পারেননি। দুঃখ ভারাক্রান্ত চিত্তে ঠাকুর মহাশয়ের শয়ন গৃহের মেঝেতে সুধীরচন্দ্র প্রায় বিনিদ্র রজনী কাটালেন।
ভাবছেন, "ত্রুটি কোথায়", "ত্রুটি কোথায়", আমাদের সমস্ত অপরাধই ঠাকুর মহাশয় ক্ষমা করেন। এবার এমন কী পর্বত-প্রমাণ অপরাধ হল যে বার ঝুড়ি আম থেকে একচিলতে আমও ঠাকুর মহাশয় নিজে গ্রহন করলেন না এবং আমাদেরও খেতে দিলেন না, ঘুরে ফিরে বার বার তার মনে পড়ছে, তার দেওয়া বুনো-তেতো আম ঠাকুর মহাশয় অনেকক্ষণ চেটে চেটে খেয়েছিলেন আর বলেও ছিলেন, "না, এই আম তিতা না, সুধীর আনছে মিষ্টি-বড় মিষ্টি।" আর তারই আনা কটকের শ্রেষ্ঠ আম এই তিনদিনের চেষ্টায় ঠাকুর মহাশয় একচিলতেও মুখে দিলেন না। প্রথম যৌবনের সে অক্ষমতার ক্ষতের উপর আজ বেদনায় তিনি বুঝতে পারছেন যে একটি বড় বিস্ফোটক জমাট হয়েছে। পরের দিন সকালবেলা ঠাকুর মহাশয় সুধীরচন্দ্রের শিরে নিজের আশীর্বাদ-ভরা হাত দু'খানি বুলাতে বুলাতে বললেন, "সুধীর, এইবার আসি গিয়া।" এরপর অনেক বছর অত্রিক্রান্ত হয়ে গেছে, ঠাকুর মহাশয় সুধীরচন্দ্রের বাসগৃহে বহুবার এসেছেন আর সুধীরচন্দ্রও বহুস্থানে ঠাকুর মহাশয়ের দীর্ঘ সান্নিধ্য লাভ করতে পেরেছেন কিন্তু কোনও সময়েই সাহস করে এই কঠিন প্রশ্নের মীমাংসার জন্য অনুরোধ করতে পারেননি। কারণ খুঁজেছেন তিনি বিস্তর কিন্তু কোনও কারণই অভ্রান্ত বলে তিনি মেনে নিতে পারেননি।
একদিন অন্য দুই ভদ্রলোককে ঠাকুর মহাশয় ভোগদানের কথা বুঝাচ্ছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে সুধীরচন্দ্র সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলেন, নিবিষ্ট ঐ বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসছেন তখন মেঘমুক্ত চিত্তে সুধীরবাবু ঐ বাড়ীর একজনকে বললেন যে, তিনি তার ভুল বুঝতে পেরেছেন। পথপার্শ্বের তেতো আম যে তিনি একদিন ঠাকুরকে দিয়েছিলেন সে আম ঠাকুর মহাশয় সাগ্রহে গ্রহণ করেছিলেন কারণ, সে সময় তার অহঙ্কার বা কুণ্ঠা কোনটাই ছিল না। কিন্তু কটকের বার ঝুড়ি যে আম তিনি এনেছিলেন সেগুলো আম নয়, অহঙ্কারের ঝুড়ি। বুঝতে তার বাকী রইল না- "দম্ভের দান, দন্ডের সমান।"
জয় রাম জয় রাম জয় রাম 🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
শিক্ষামূলক ব্যাখ্যা ও পরিশিষ্ট
মূল শিক্ষা (সংক্ষেপে)
- নম্রতা ও আন্তরিকতা গুরুর কাছে মূল্যবান; যে উপহার আন্তরিক, তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য।
- অহংকারপূর্ণ প্রদর্শনী বা প্রবৃত্তির দ্বারা দান যদি করা হয়, তার মর্ম মূল্যহীন বা ক্ষতিকর হতে পারে — এটি দান নয়, দণ্ড (শাস্তি)-এর সমতুল্য হতে পারে।
- গুরু বা সৎব্যক্তি যে প্রতিক্রিয়া দেন, তা শিষ্যের চরিত্র-সংস্কারের অংশ হিসেবে বোঝা উচিত — কখনও ধৈর্য, কখনও কঠোর অনুশাসন দেখানো হয়ে থাকে।
- সময়ের পরিবর্তন—কঠিন পরিশ্রম, ধৈর্য, এবং সৎচেতনা জীবন বদলে দিতে পারে (সুধীরচন্দ্রের কাহিনি এটি প্রদর্শন করে)।
প্রশ্নোত্তর (ধারণা চিন্তার জন্য)
- প্রথম ঘটনার তিতে আম ও পরে কটকের আম — এখানে ঠাকুরের আচরণ থেকে আপনি কী শিখলেন?
- দান করার উদ্দেশ্য (যোগাযোগ/শো-অফ/আন্তরিকতা) কীভাবে বিচার করবেন?
- গুরু বা সৎ মানুষ যখন সংযম বা অসংলগ্ন আচরণ করেন, তখন তা কি সবসময় অপর্যাপ্ততা বুঝায় না — কখনও তা উপদেশের অংশও হতে পারে কি না?

0 Comments